মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪
১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

প্রতি চার মিনিটে করোনায় মৃত্যু হচ্ছে একজনের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | আপডেট: বুধবার, মে ২৪, ২০২৩

প্রতি চার মিনিটে করোনায় মৃত্যু হচ্ছে একজনের
দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় পর বিশ্বব্যাপী কোভিড জরুরি অবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। তবুও প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে এখনও প্রতি চার মিনিটে মৃত্যু হচ্ছে কমপক্ষে একজনের। সংক্রামক এই ভাইরাসকে ঠিক কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সে সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

আর এতেই দুর্বল মানুষ এবং কম টিকাপ্রাপ্ত দেশগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে বুধবার (২৪ মে) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ মানুষের জন্য করোনাভাইরাসের হুমকি কমলেও বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যার একটি অংশের জন্য এটি এখনও অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে রয়েছে গেছে। আর তাই সংক্রামক এই ভাইরাসকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ বা মোকাবিলা করা যায় তা বর্তমানে বড় ধরনের প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে।

ব্লুমবার্গ বলছে, জনসংখ্যার যে অংশের জন্য কোভিড এখনও অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করা হচ্ছে তাদের সংখ্যা ঠিক কত তা জানা না গেলেও এই সংখ্যাটি অনেকের উপলব্ধির চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর কারণ হিসেবে কোভিড এখনও নেতৃস্থানীয় পর্যায়েই রয়ে গেছে।

গত বছর হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের পর কোভিডে আক্রান্ত হয়েই যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। অর্থাৎ মৃত্যুর কারণ হিসেবে গত বছর উত্তর আমেরিকার এই দেশটিতে কোভিড ছিল তৃতীয় অবস্থানে।

মৃত্যুর অন্যান্য সাধারণ কারণ যেমন ধূমপান এবং সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা আইনের দিকে মনোযোগ দেওয়া হলেও করোনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদরা ক্ষতি কমানোর উপায়গুলোর দিকে তেমন মনোযোগ দিচ্ছেন না। বাধ্যতামূলক টিকা বা আবদ্ধ জায়গায় মাস্ক পরার কথাও এখন আর গুরুত্ব দিয়ে বলা হচ্ছে না।

সংবাদমাধ্যম বলছে, সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- বর্তমানে বিশ্বে প্রতি চার মিনিটে একজন করে কোভিড আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু ঘটছে। মৃতদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি আছেন বয়স্করা। আর এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর তৈরি হয়েছে নতুন করে আতঙ্ক।

অবশ্য করোনা মহামারি পেছনে ফেলে বিশ্বজুড়ে বর্তমানে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে করোনাভাইরাস মহামারি আর ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ নয় বলে ঘোষণা করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে বিশ্বের প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়।

করোনায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটিও ঘটেছিল চীনে। এরপর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

কিন্তু তাতেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় অবশেষে ওই বছরের ১১ মার্চ করোনাকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছিল ডব্লিউএইচও। তবে সাম্প্রতিক সময়ে করোনার প্রকোপ কমে আসায় কোভিড-১৯ সংক্রান্ত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার অবসান ঘোষণা করে সংস্থাটি।

অবশ্য সংক্রমণ কমলেও বিশ্বে এখনও প্রতিদিনই বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে করোনায়। ৭৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশে নিজের রিপোর্ট পেশ করার সময় ডব্লিউএইচওর প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস অবশ্য বলছেন, ‘বিশ্বব্যাপী করোনা সম্পর্কিত স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও তা বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাসের স্বাস্থ্য হুমকির সমাপ্তি নয়।’

তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বে করোনাভাইরাসের আরেকটি ভ্যারিয়েন্ট উদ্ভূত হওয়ার হুমকি এখনও রয়ে গেছে যা নতুন করে এই রোগ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়াতে পারে এবং নতুন করে আরও রোগজীবাণু উদ্ভূত হওয়ার মারাত্মক হুমকি এখনও রয়ে গেছে।’

মিসৌরির ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স সেন্ট লুইস হেলথ কেয়ার সিস্টেমের ক্লিনিকাল এপিডেমিওলজি সেন্টারের পরিচালক জিয়াদ আল-আলী বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্বের সাধারণ আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে মহামারিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া এবং কোভিডকে আমাদের পেছনে রাখা। কিন্তু এই সমস্যা বা পরিস্থিতিকে স্বীকার করতে অনিচ্ছুক আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোভিড এখনও অনেক লোককে সংক্রমিত করছে এবং মৃত্যু ঘটাচ্ছে। আমাদের কাছে এটি কমিয়ে আনার উপায়ও রয়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের মত, কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে দীর্ঘ পরিকল্পনা নেওয়া উচিত ছিল, তা গ্রহণ করা হয়নি। সেই সঙ্গে রয়েছে মানুষের একাংশের মাস্ক পরার অনীহা। উন্নত দেশগুলোর অনেকেই টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করার কারণও এই ঘটনার পেছনে দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২১ সালে ইমিউনাইজেশনের অভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ লাখেরও বেশি কোভিড আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছিল। অর্থাৎ প্রতি ২ জন কোভিড আক্রান্তের মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়। যদি টিকা এবং মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হতো, তবে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যায় রাশ টানা যেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, যে কোনও উন্মুক্ত স্থান এখনও কোভিড সংক্রমণের সুপার স্প্রেডার হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, এই তালিকায় রয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো কেন্দ্রগুলোও। এ ব্যাপারে সচেতন না হলে স্থায়ীভাবে কোভিড সংক্রমণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা কঠিন হবে।

এ ব্যাপারে চীনের উহানের ল্যাব প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন তারা। উহানের ল্যাব থেকে কোভিড ভাইরাস ছড়িয়েছিল বলে দাবি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এ ব্যাপারে চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়া হলেও দেশটি তা দিতে অস্বীকার করে। এই ধরনের মানসিকতা কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাধা হয়েছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অবশ্য বিশ্বকে পুরোপুরি কোভিডমুক্ত করতে টিকাদান কর্মসূচির গতি বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
0 Comments